মিছিল

আমাদের বাঙালি জাতির সূচনালগ্ন থেকে আমরা যে শব্দগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত “মিছিল” তাদের মধ্যে অন্যতম। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ অবাধ মিছিল আমাদের প্রতিবাদেও প্রধান ভাষা, আমাদের চেতনার বহি:প্রকাশ। একই সাথে আমাদের উল্লাস, আমাদের আনন্দ, আমাদের বিজয়ের ভাষা ছিল মিছিল। আর মিছিলের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে স্লোগান। প্রতিবাদের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে স্লোগানের ভাষাও তীব্র হতে থাকে। সাথে সাথে শোষকশ্রেণীর আক্রমনের লক্ষ্যবস’ও হয়ে ওঠে মিছিল। মিছিলে শোষকশ্রেণীর চালানো গুলিতে নিহত বাঙালির সংখ্যা অগণিত। তাদের আক্রমণ মিছিলকে করে তোলে আরো শাণিত,গর্জে ওঠে সাধারণ মানুষের দল। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নেয় মিছিলে। মিছিলের আয়তন যত বৃদ্ধি পায়, শোষকশ্রেণীর ভিতও তত নড়ে ওঠে,ও এক সময় অর্জিত হয় কাঙ্খিত বিজয়। জয়লাভ ঘটে চেতনার। এটাই মিছিলের ঐতিহ্য ইতিহাস। মিছিল তাই আমাদের গর্ব,আমাদের ভালবাসা। আমাদের প্রতিবাদের আমাদের উল্লাসের ভাষা।

কিন’ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মিছিল তার এই ঐতিহ্য হারিয়েছে। মিছিল এখন আর শুধু শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা বা আমাদের উল্লাসের ভাষা না। সুবিধাবাদী মানুষের দল মিছিলকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে আর ধ্বংস  করেছে আমাদের ইতিহাস,ঐতিহ্যকে সাধারণ মানুষ এখন আর স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে অংশ নেয়না, টাকা দিয়ে ছিন্নমূল মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে সংগঠিত করা মিছিল। একই সাথে মিছিলের ভাষা কথা স্লোগানগুলো হয়ে গেছে নিকৃষ্ট,অশ্লীল। মিছিলের সময় নির্বিকারে ভাঙচুর, মারামারি, অবৈধ অস্তের ব্যবহার মিছিলকে দিয়েছে পুরোদস’র ধ্বংসাত্বক রূপ।  একসময়ের বাঙালি জাতির প্রতিবাদের প্রধান ভাষা আজ হয়ে গেছে আতঙ্কের নামান্তর, বিশেষত্বহীন অদ্ভুত এক ধ্বংসাত্বক ভাষা।

আমাদের সেই চেতনার মিছিলের এমন অপমৃত্যুতে আমরা শোকাহত কিন’ হতাশ নই। আমরা আমাদের সেই চেতনার পুনর্জম্নের প্রতীক্ষা করছি।  আমরা এক নতুন মিছিলের স্বপ্ন দেখছি যার আয়তন হবে অতীতের যে কোন মিছিলের চেয়ে দীর্ঘতর, যার স্লোগান হবে আরো ধারালো,আরো তীব্র। আমরা এক আলোর মিছিলের স্বপ্ন দেখছি, যার তীব্রতা ক্ষমতাপিপাসু.নীতিহীন শোষকদের চোখ ঝলসে দিবে। আর সেই আলোর মশালধারী স্বপ্নবাজ মানুষদের সম্মিলনে তৈরী হবে এক নতুন দিগন্ত,আলোকিত করবে গোটা পৃথিবীকে।

আমরা শুধু স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হয়নি। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য শুরু করেছি আমাদের পদযাত্রা। আমাদের সেই পদযাত্রার নাম মিছিল। চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি ২০০৯ সাল থেকে পরিচালনা করছে মিছিল নামে একটি বিভাগের। আমরা স্বপ্ন দেখি মিছিল হবে একটি পত্রিকার নাম, একটি ব্লগের নাম। যেখানে সারা বাংলাদেশের সকল স্বপ্নবাজ,সকল দেশপ্রেমী মানুষের ভাষা উচ্চারিত হবে। মিছিল হবে মানবতাবাদী একদল মানুষের সম্মেলন যাদের মধ্যে মমতা থাকবে, যারা হিংস্র হবেনা। মিছিল হবে একটি স্কুল যেখানে আগামী দিনের অগ্রপথিকদের চেতনার বিকাশ ঘটাতে কাজ করবে। আমাদের চেতনা যত তীব্র হবে, ক্ষমতাপিপাসুদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ তত তীব্র হবে। আলোর মশালধারী মানুষের সংখ্যা যত বেশি হবে নীতিহীনদের ভিত তত তীব্র ভাবে নড়ে উঠবে এবং বিজয় ঘটবে এক নতুন আলোর মিছিলের।

আলোর মশালধারী এই মানুষের সম্মিলন ঘটাতে আমাদেরই। এ দায়িত্ব আমাদের বর্তমান প্রজন্মের্‌ আর এ কাজে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকেই। দেশ ও জাতির প্রতি এটা আমাদের দায়বদ্ধতা।

লেখকঃ
শাহনেয়াজ রাহাত
ভাইস প্রেসিডেন্ট ও “মিছিল” সম্পাদক
চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি

Comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s